
হাতিয়া প্রতিনিধি: নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চোরাই ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের অবৈধ ব্যবসা চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। হাতিয়া থেকে নলচিরা ঘাট পর্যন্ত নৌপথ এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সড়কগুলো বর্তমানে চোরাই তেল পরিবহন ও বিক্রির নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
হাতিয়ার সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ঘাটগুলোর মধ্যে নলচিরা, চরচেঙ্গা ও তমরুদ্দি উল্লেখযোগ্য। নদী পার হয়ে সোনাপুর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত আঞ্চলিক মহাসড়কটি সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বর থানার মোড় হয়ে ৪নং ঘাট চরজব্বর পুলিশ ফাঁড়ির সামনে দিয়ে হাতিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান ঘাটে গিয়ে মিলিত হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, এই সড়ক এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত গ্রামীণ সড়কগুলো ব্যবহার করে একটি চোরাই তেল কারবারি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
বিশেষ করে হাতিয়া উপজেলার চরঈশ্বর ও নলচিরা ইউনিয়নের মধ্যবর্তী নলচিরা ঘাট এলাকায় অবৈধ ব্যবসা আরও বেপরোয়া আকার ধারণ করেছে। কলেজ গেইট থেকে নলচিরা ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি গোডাউনে দিন-রাত চোরাই তেল মজুত ও বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দিনের বেলায় সীমিত পরিসরে লেনদেন হলেও রাত ১২টার পর বড় পরিসরে কেনাবেচা শুরু হয়ে ভোররাত পর্যন্ত চলে। সমুদ্রপথে সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানির তেল ডিপোতে নেওয়ার পথে ছোট-বড় নৌকা ব্যবহার করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা জাহাজ থেকে ব্যারেলজাত তেল স্বল্পমূল্যে সংগ্রহ করে অধিক দামে বিক্রি করছে। এতে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জাহাজ থেকে তেল বিক্রি ও মজুদের এমন তথ্য-উপাত্ত বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র দাবি করেছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার কিছু অসাধু ব্যক্তি ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণেই এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না। অতীতেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, আওয়ামী লীগ পতনের পর নতুন করে চোরাই তেল সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের কিছু লোভী সদস্য। ওই দলের প্রায় ৪০–৫০ জন পদপ্রত্যাশী কর্মী মিলিয়ে অন্তত ৮টি সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নলচিরা ঘাট এলাকায় বাসু মেম্বার, আলা উদ্দিন সারেং, ইব্রাহিম, সাহেদ, মঞ্জু সারেং, আব্দুরব মেম্বার, ইরাক সারেং ও আজিমের নেতৃত্বে পরিচালিত সিন্ডিকেটগুলো বেশি সক্রিয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে চোরাই ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, পাম অয়েল, কয়লা, অনুমতিবিহীন সিমেন্ট ও ইউরিয়া সার মায়ানমারসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংবাদ প্রকাশ হলে প্রশাসন মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করলেও পরবর্তীতে নীরব হয়ে যায়। এতে সচেতন নাগরিক মহলে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
আইন অনুযায়ী জ্বালানি তেল বিক্রির জন্য ট্রেড লাইসেন্স, বিস্ফোরক লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, এজেন্সি লাইসেন্স এবং জেলা প্রশাসনের অনুমোদন আবশ্যক। তবে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ দোকান ও গোডাউনের এসব কাগজপত্র নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বললে তারা দাবি করেন, টাকা দিয়ে তেল কিনে বিক্রি করলে তা অবৈধ হয় না। আজিম নামের এক সিন্ডিকেট সদস্য এই প্রতিবেদককে বলেন, “জাহাজ থেকে টাকা দিয়ে তেল কিনে ব্যবসা করি, এটা বৈধ।”
অন্যদিকে ইরাক নামে আরেক সদস্য বলেন, “আপনি নোয়াখালীর লোক হয়ে এটা নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? এখানে অনেক সাংবাদিক আছে, সব দিক ম্যানেজ করেই ব্যবসা করছি।” এরপর তিনি ফোন কেটে দেন এবং পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
চক্রটি আরও দাবি করে, তেল বিক্রির জন্য জেলা প্রশাসন ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সকল অনুমতি তাদের রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এমন কোনো বৈধ নথি পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরাই তেল ব্যবহারের ফলে একদিকে যানবাহনের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে আশপাশের বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। পাশাপাশি সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
এ বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও কার্যকর নজরদারি না বাড়ানো হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলা উদ্দিন বলেন, “নলচিরা ঘাটে একাধিকবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। কিছুদিন এসব কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এখন যদি পুনরায় চালু হয়ে থাকে, তাহলে আমরা দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।