
নোয়াখালীর সদর দক্ষিণাঞ্চলের মেঘনা প্লাবিত তিনটি ইউনিয়ন ছিল, যথাক্রমে- চরবাটা, চর জব্বার এবং চরক্লার্ক। এ তিনটি ইউনিয়নকে ভেঙে পরবর্তীতে আটটি ইউনিয়ন করা হয়। ইউনিয়ন গুলো – চর জব্বার, চর বাটা, চর ক্লার্ক, চর ওয়াপদা, চর জুবলী, চর আমানউল্যা, পূর্ব চর বাটা এবং মোহাম্মদপুর। ২০০৪ সালে কে বিভক্ত করে এটি গঠিত হয়। মূলত তখনকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য জনাব সাহেবের আমন্ত্রণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম হেলিকপ্টারে করে এসে এ উপজেলার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।
গুরুজন মুখে শুনতে পেলাম, আমার শ্রদ্ধেয় চাচা মরহুম হাজী মাহফুজুল হক (সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার অব:) পায়ে হেটে বর্তমান ওয়াপদা, জব্বারের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনার শাখা নদী পাড়ি দিয়ে সোনাপুর হয়ে চৌমুহনী পাইলট স্কুলে পড়া – লেখা করেছিলেন। আমার বাবা মরহুম সায়েদুল হক প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বেশি দূর লেখা – পড়া করতে হয়নি বিধায় ওনাকে এ কষ্ট টুকুন করতে হয়নি।
সত্তরের প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসলীলার পর সে নদী তার যৌবন হারিয়ে ফেলে ক্রমশ চর জেগে ওঠে। আর সেই সুযোগে নোয়াখালীর একসময়কার প্রভাবশালী নেতা মরহুম ের সদিচ্ছার কারনে সোনাপুর থেকে বেড়িবাঁধের কাজ সম্পন্ন হয় এবং এতদাঞ্চলের লোকজনের শহরের সাথে যোগাযোগটা কিছুটা সহজতর হয়। আমার জানামতে ঐ সময়ের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার মধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান মোকছোদ মিয়া (নামের বানান নিয়ে সংশয় আছে) ছিল অন্যতম। আলহাজ্ব খলিলুল্লাহ চেয়ারম্যান, খায়রুল আনম সেলিম চেয়ারম্যান এবং সোলেমান চেয়ারম্যানের রাজত্ব ছিল সদর দক্ষিণাঞ্চল। সেলিম চেয়ারম্যানের লাগাতার চেয়ারম্যানিত্বের ছেদ ঘটিয়ে এ অঞ্চলে আবির্ভূত হন মোকছোদ মিয়া এবং হলেন বৃহত্তর চরবাটার চেয়ারম্যান। ইউপি চেয়ারম্যান পদে অল্প কিছুদিন থাকার পর জাতীয় পার্টির আনুকুল্যপ্রাপ্ত হয়ে অনেকটা প্রমোশন নিয়ে বনে যান উপজেলা চেয়ারম্যান। তারপর চরবাটা খাসের হাট স্কুল ভবনের কাজে হাত দেওয়া সহ এ অঞ্চলের উন্নয়নে কিছু ভুমিকা শুরু করেছিলেন বটে কিন্তু সদরের লোকের চাপে এখানে তিনি তেমন অবদান রাখতে পারেননি। তবে আমরা আনন্দিত ছিলাম যে, জেলা লেবেলের একজন নেতা আমাদের এ অঞ্চলের ছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে সত্তুরের বন্যার পরবর্তী সময় থেকে যিনি চরবাটাকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন, তিনি আবার শুরু করলেন চেয়ারম্যানি। চেয়ারম্যান ভোটে সন্দীপীওয়ালা আর বামনিওয়ালা এ তকমা দিয়ে খায়রুল আনম সেলিমের কাছ থেকে চেয়ারম্যান পদ কেড়ে নিতে বরাবরের মতো সকলেই ব্যর্থ হয়ে আসছিল বারংবার। বর্তমান প্রথিতযশা আইনজীবী এ বি এম জাকারিয়া সাহবের বড়ো ভাই আবু তাহের মিয়া বহু চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পারেননি। ১৯৯১ সালের ইউপি নির্বাচনে সকলেরই অল্প-বিস্তর ধারণা ছিল তাহের মিয়া চেয়ারম্যান হবে। আমিও প্রায় ৩-৪ হাজার লোকের সামনে জাকারিয়া ভাই সহ শান্তির হাটের উত্তরে জমিনের ভিতর এবং নির্বাচনের সর্বশেষ জনসভা আরজি স্কুলের মাঠে বক্তব্য দিয়েছিলাম, তাহের মিয়ার ভোটে ছিলাম, কিছুতে কিছুই হলোনা। আমাদের সকলকে কাঁদিয়ে সেবারও সেলিম চেয়ারম্যান বিজয়ের মালা পরে জনসম্মুখে উপস্থিত হয়েছিলেন।
১৯৯১ সালে প্রথম গনতান্ত্রিক ধারায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত মনোনীত এমপি প্রার্থী ছিলেন আমাদের চরবাটারই সন্তান ডাঃ বোরহান উদ্দিন। কিন্তু বিএনপি প্রার্থী সাহেবের সাথে টিকতে পারেননি। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের এলাকা থেকে দু’জন প্রার্থী হয়ে ছিলেন, আওয়ামী লীগ থেকে অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিম এবং জামায়াতে ইসলামী থেকে ডাঃ বোরহান উদ্দিন। ওনাদের দুই জনের কেউ বিএনপি প্রার্থী মুহাম্মদ শাহজাহান সাহেবকে অতিক্রম করতে পারেননি। সেবার অবশ্য খুব কাছাকাছি ভোটে অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিম এমপি প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নিকট হেরে গিয়ে ছিলেন। সেটা ছিল ওনার এবং সদর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্যে সেরা সুযোগ, কারন সেবছর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছিল। পরবর্তীতে খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম তার প্রতিষ্ঠিত সৈকত ডিগ্রি কলেজে ‘অধ্যক্ষ’ এবং ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হিসেবে পূণরায় জনসেবায় ব্রতী হন। তিনি তাঁর সমর্থিত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দৌড় ঝাপ করে এলাকার রাস্তা ঘাট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন।
২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে এবং মোহাম্মদ শাহজাহান সাহেব পূণরায় এমপি পদে নির্বাচিত হন। তাঁর নির্বাচনী এলাকা হিসেবে সোনাপুর থেকে চেয়ারম্যান ঘাটের সড়ক সহ কিছু শাখা রাস্তা পাকা করেন, এতে আমাদের যাতায়াতের অনেক সুবিধা হয়। দক্ষিণাঞ্চলকে আরো উন্নত করতে এবং চরের মানুষের প্রশাসনিক সেবা সহজতর করার জন্যে ২০০৪ সালে গঠন করা হয় ‘সুবর্ণচর’ উপজেলা। তারপর থেকে শুরু হয় নতুন ইতিহাস, নতুন উদ্দীপনা। প্রথম অবস্থায় নিজস্ব উপজেলা ভবন না থাকায় চর জুবিলী ইউনিয়ন পরিষদে অস্থায়ী অফিস কার্যক্রম চলে প্রায় তিন বছর। নতুন উপজেলার প্রথম ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন জনাব বিল্লাল হোসেন, ভালো লোক ছিলেন কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যান না থাকায় তখন জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন তেমন ঘটেছে বলে মনে হয় না। এভাবে খুড়িয়ে খুড়িয়ে উপজেলা কার্যক্রম ২০০৯ পর্যন্ত চলে।
অবশেষে ঐ বছরই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে সায়েদুল হক ভুঞাকে পরাজিত করে অধ্যক্ষ খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সুবর্ণচরের উত্তরাঞ্চলের কারো কারো ধারণা নির্বাচনের ফলাফল তাদের মন মতো হয়নি। আসলে সে নির্বাচন এবং ফলাফল ছিল একেবারে স্বচ্ছ, আমি আগ-পর একেবারে কাছ থেকে বলতে গেলে পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম। আর ইউএনও জনাব মুহাম্মদ সানাউল হক থেকে তখন বেআইনি কিছু করাও কারো পক্ষে সম্ভব ছিলোনা।
উপজেলা নির্বাচনের কয়েকমাস পূর্বে একই বছর সংসদ নির্বাচন হয়েছিল, তাতে বারবার নির্বাচিত এমপি জনাব মুহাম্মদ শাহজাহান সাহেবকে পরাজিত করে নব্বই পরবর্তী এ প্রথম আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জনাব এমপি নির্বাচিত হন। অধ্যক্ষ খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সুবর্ণচরের রূপ পরিবর্তন হতে থাকে। শাখা রাস্তা গুলো পাকাকরণ, স্কুল – কলেজ – মাদ্রাসার ভবন সহ নানাবিধ উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়, এ বিষয়ে এমপি মহোদয়ের সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। রাস্তাঘাট, পোল-কালভার্ট অনেক হয়েছে বটে কিন্তু আমার বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া সতের শত ফুটের মতো রাস্তা অনেক চেষ্টা করেও পাকা করাতে পারিনি! একদা বিষয়টি নিয়ে একটা দরখাস্ত হাতে নিয়ে বুকে ফু দিয়ে সাহস করে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এমপি একরামুল করিম চৌধুরী কাছে গেলাম। কিন্তু ফু কে ভোঁ করে উড়িয়ে দিয়ে তিনি আমাকে কার্যালয়ের বাইরে চলে যেতে বললেন। অগত্যা হতাশা আর নিরাশায় আচ্ছন্ন হয়ে সেখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। ক্ষণেক বিলম্বে না জানি কিল-ঘুষি এসে পড়ে এজন্যে দ্রুত জায়গা ত্যাগ করা বাঞ্ছনীয় মনে করে সরে পড়লাম তাড়াতাড়ি। এখনতো আমি শিক্ষক, অথচ একানব্বই সালে ছিলাম ছাত্র। তখন, এখনকার এমপি মোহাম্মদ শাহজাহান সাহেবের কাছে এলাকার বিদ্যুৎ লাইন বিষয়ে গিয়েছিলাম এমপি হোস্টেলে। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বসিয়ে রেখে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফোন করেছিলেন, এতে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। সে যা-ই হোক, আমার বাড়ির সামনে রাস্তা এখনো পাকা না হলেও সুবর্ণ চরের অনেক রাস্তা পাকা হয়েছে এটা আমাকে স্বীকার করতেই হবে।
বর্তমানে সুবর্ণচরে চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে দৃষ্টি নন্দন বড় বড় অট্টালিকা সহ চরবাটা খাসের হাট এবং সৈকত সরকারি কলেজ কেন্দ্রিক নতুন সভ্যতা গড়ে উঠেছে। এছাড়া হারিছ চৌধুরী বাজার এবং চর জব্বার ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রিক, উপজেলা কার্যালয় – চরজুবলি রাব্বানিয়া ফাযিল মাদ্রাসা ও চর জব্বার থানা কেন্দ্রিক, ভূঁইয়ার হাট, বাংলা বাজার, আক্তার মিয়ার হাট এবং থানার হাট কেন্দ্রিক বহু পাকা দালান, সুন্দর, মনোরম, দৃষ্টিনন্দন বাড়ি ঘর তৈরি হয়েছে। এখনকার দৃশ্য গুলো দেখলে মনে হয়না যে একসময় এই সুবর্ণ চরের ‘সুবর্ণ’ টা ছিলোনা, পায়ে হেঁটে মাইজদী যেতে হতো। বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সুবর্ণচরের উন্নয়নে এবং এর সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সম্মিলিত ভাবে যেন অত্যাধিক পরিমাণে ভূমিকা রাখেন।
সুবর্ণচরে রাজনৈতিক সজ্জন ব্যক্তিদের যতটুকু জানি সুযোগ পেলে তারা সকলে এ এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন। ক্ষমতাসীন সরকারি দলে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তি রয়েছেন, আমার মনে হয় এ প্রথম একজন কেন্দ্রীয় নেতা পেলাম যিনি ইচ্ছে করলে সুবর্ণচর নিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব। নাসির উদ্দিন নাসির কেন্দ্রীয় ছাত্র দলের সাধারণ সম্পাদক এটি আমাদের জন্যে গৌরবের, শত বছরে এমন সুযোগ কবারইবা আসে। আমরা আশান্বিত হই যখন আমাদের কেউ জেলা বা কেন্দ্রে নেতৃত্ব দেয়। আজগর উদ্দিন দুখু জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি তাকেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, এডভোকেট এবিএম জাকারিয়া ভাই তো পূর্ব থেকে জেলাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এছাড়া নূরুল ইসলাম আজাদ মোহাম্মদ পুর, নিজাম উদ্দিন ফারুক চর জুবিলী, জামাল উদ্দিন গাজী পূর্ব চরবাটা, বেলাল হোসেন সুমন চর আমানুল্যা, এরা সকলেই স্বমহিমায় উজ্জ্বল – প্রজ্জ্বলিত। জামায়াতে ইসলামীর ডাক্তার বোরহান উদ্দিন, মাওলানা জামাল উদ্দিন, আওয়ামী লীগের অধ্যক্ষ খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম সকলের মুরুব্বি, এডভোকেট ওমর ফারুক এবং এডভোকেট আবুল বাসার ডিপ্টি সহ সম্মিলিত ভাবে চিন্তা করে, “আমাদের ‘সুবর্ণচর’কে আমরা আমাদের মনের মতো করিয়া গড়িয়া লইবো, এ হোক আমাদের সাধনা”, তাহলে সুবর্ণচরের চেহারায় আলো ফুটবে সবসময়। ঘরে ঘরে উচ্চ শিক্ষিত, হাতের নাগালে স্কুল কলেজ, বিএডিসি বিনা’র দপ্তর, বহুতল ভবন, বড়বড় পুকুর, সুদৃশ্য তোরণদ্বারে বেষ্টিত বাড়ি, মাছে ভাতে বাঙালি, ঘরে ঘরে সরকারি চাকুরিজীবি, ছেলে মেয়েদের কলকাকলিতে মুখরিত শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষার হার শতভাগে উন্নীতকরণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ইত্যাদি গুণাবলিতে পরিপূর্ণ করতে পারলে সুবর্ণচরের সত্যিকার রূপ অপরূপ হিসেবে দেখতে পাবো আমরা অচিরেই, সেদিনটি যেন খুব কাছে হয়।
সুবর্ণচর উপজেলার প্রথম চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম, সুবর্ণচর উপজেলাকে উন্নয়নের যে ট্রেনে তুলে দিয়ে গিয়েছেন, সে গন্তব্যে পৌঁছাতে নিয়ে যেতে হবে নব্য তরুণ নেতৃত্বকে। আর সে গন্তব্য যেন সুখকর – সুমধুর হয়, এ প্রত্যাশা আমাদের সকলেরই থাকবে।
মোহাম্মদ নিজাম উদ্দীন
শিক্ষক ও কলামিস্ট