
বিশ্বের ইতিহাসে যুগে যুগে বহু রাষ্ট্র তাদের পরাধীন শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কখনো কূটনৈতিক সমঝোতা, আবার কখনো রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে স্বাধীনতার বড় উদাহরণ হলো ভারত ও পাকিস্তান। তবে ১৯৪৭ সালের আপাত রক্তপাতহীন স্বাধীনতার পেছনে উপমহাদেশের প্রায় ১৯০ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ইতিহাস বিদ্যমান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের জন্য কিছুটা আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। এর ফলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পথ অনেকটাই সুগম হয়। এরপর দীর্ঘ তেইশ বছরের ভাষাগত, রাজনৈতিক ও শাসনগত বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে।
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নির্মম কিন্তু গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই ইতিহাস শুধু স্মরণ করার নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—সংকীর্ণ মানসিকতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অতিরিক্ত আবেগের কারণে পরবর্তী প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে ইতিহাস মূলত সত্যনির্ভর বিজ্ঞান। ইতিহাস কখনো ধর্মগ্রন্থ, কখনো বিজ্ঞান, আবার কখনো সাহিত্য থেকে উপাদান সংগ্রহ করে অতীতের ঘটনাবলিকে প্রমাণের আলোকে বিশ্লেষণ করে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস হলো—
“অতীতের সত্য ঘটনাবলির সুশৃঙ্খল ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনা।”
সহজভাবে বলা যায়, যে শাস্ত্র অতীতের ঘটনাকে অনুসন্ধান, যাচাই ও ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করে, সেটিই ইতিহাস। ইতিহাসের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—
১. অতীত ঘটনাভিত্তিক আলোচনা
২. প্রমাণনির্ভর বিশ্লেষণ
৩. কারণ–কার্য সম্পর্ক ব্যাখ্যা
৪. ঘটনাক্রমিক উপস্থাপন
৫. সমাজ ও মানবজীবনের পরিবর্তনের ধারা তুলে ধরা
বিশ্বখ্যাত ঐতিহাসিকদের সংজ্ঞাতেও ইতিহাসের এই বৈজ্ঞানিক চরিত্র স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। থুসিডিডিস ইতিহাসকে অতীতের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বলেছেন। জে. বি. বুরি ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। লিওপোল্ড ভন রাঙ্কে জোর দিয়েছেন “যা সত্যিই ঘটেছিল” তা তুলে ধরার ওপর।
এই সংজ্ঞার আলোকে প্রশ্ন ওঠে—আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমরা কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছি?
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর—এই নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম হয়েছিল, এটি প্রমাণিত ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু এই সময়ে প্রকৃতপক্ষে কতজন মানুষ শহীদ হয়েছেন, কতজন আহত হয়েছেন কিংবা কতজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—তার সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণভিত্তিক হিসাব কি আমরা আজও জানি?
দুঃখজনক হলেও সত্য, যে বর্ণনা আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছি, তার বড় একটি অংশ ইতিহাস নয়—বরং সাহিত্যিক আবেগনির্ভর উপাখ্যান।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সংখ্যার ভিন্ন ভিন্ন অনুমান পাওয়া যায়।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনে এক সাক্ষাৎকারে শহীদ সংখ্যা উল্লেখ করতে গিয়ে ভাষাগত বিভ্রান্তিতে “৩ মিলিয়ন” শব্দটি ব্যবহার করেন, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও আবেগতাড়িত ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রশ্নাতীত সত্যে পরিণত হয়। এর ফলশ্রুতিতে আজ কেউ কেউ ৩ কোটি, এমনকি ৩০ কোটি শহীদের কথাও বলেন—যা ইতিহাসকে হাস্যকর পর্যায়ে নামিয়ে আনে।
জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ইতিহাস যে প্রজন্ম গ্রহণ করে না, তার প্রমাণ ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান। ইতিহাসের এই বিকৃতি রাষ্ট্র ও সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
সঠিক ইতিহাস প্রতিষ্ঠার জন্য এখনো সময় আছে। জীবিত সেক্টর কমান্ডার, সৎ ও মানসিকভাবে সক্ষম মুক্তিযোদ্ধা এবং নিরপেক্ষ গবেষকদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের প্রমাণভিত্তিক ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরা জরুরি।
মিথ্যা বীরবন্দনা নয়, সত্যনির্ভর ইতিহাসই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করে। বিভেদ নয়—ঐক্য, ধ্বংস নয়—সৃষ্টি, মিথ্যা নয়—সত্যের চর্চার মাধ্যমেই আমরা এগিয়ে যেতে পারি।
পরিশেষে মুক্তিযোদ্ধা, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতি আহ্বান—পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে এগিয়ে আসুন। দলীয় আবেগ নয়, সত্য ও প্রমাণকে প্রাধান্য দিন। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।